১৯৭৬ সালের স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে জেলা পরিষদকে ৯৭টি কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। ওই কার্যাবলি আবার বাধ্যতামূলক এবং ঐচ্ছিক—দুইভাগে ভাগ করা হয়। তাছাড়া জেলা পরিষদকে থানা, ইউনিয়ন ও পৌরসভাগুলোর কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের দায়িত্বও দেয়া হয়। পরে ১৯৮৮ সালের জেলা পরিষদ আইনের অধীনে জেলা পরিষদকে ১২টি বাধ্যতামূলক এবং ৬৯টি ঐচ্ছিক কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে কোনোটাই কাজ করেনি। অন্যদিকে উপজেলা পরিষদ সৃষ্টি, পৌরসভার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী করার পরে জেলা পরিষদের আওতায় প্রত্যক্ষভাবে উন্নয়ন কার্য সম্পাদনের আওতা আগের চেয়েও অনেক বেশি সীমিত হয়ে পড়েছে। জেলা পরিষদকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে তার জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র এবং নতুন ভূমিকার অন্বেষণ প্রয়োজন, যাতে জেলা পরিষদের কার্যক্রম অপরাপর স্থানীয় পরিষদগুলোর ক্ষমতা, কার্যাবলি ও ভূমিকাকে সংকুচিত করার বদলে সহায়ক হয়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ প্রত্যক্ষভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারীর ভূমিকার চেয়ে যদি উন্নয়ন সমন্বয়, রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রমগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, জেলায় কর্মরত সরকারি বিভাগগুলোর কার্যক্রমের মধ্যে একটি সমন্বয়, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা আনয়ন এবং উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোকে সহায়তা দান কার্যক্রমকে জোরদার করতে পারে, তাহলে জেলা পরিষদের গঠন সার্থক হতে পারে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ এবং পৌরসভাগুলোর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ বা তাদের কাজ সংকুচিত করে জেলা পরিষদকে কার্যকর রাখা কোনোভাবেই সঠিক হবে না এবং সম্ভবও হবে না। তাই অনেকেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে জেলা পরিষদকে পুনরায় চালু না করার বিষয়ে মতামত দিয়ে থাকেন। চালু এ পরিষদকে শক্তিশালী না করে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি ভ্রান্ত ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
জেলা পরিষদকে গণতান্ত্রিক, অংশগ্রহণমূলক এবং জবাবদিহিমূলক করার জন্য স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন-২০২৪ কর্তৃক বিজ্ঞতার সঙ্গে প্রস্তাবিত নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, জেলা পরিষদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট জেলার অধীন উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভোটার হন। যদি কোনো জেলায় সিটি করপোরেশন থাকে, তাহলে সেই সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও পরিষদের নির্বাচনে ভোটার হিসেবে গণ্য হন। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদে সরাসরি ভোট হবে সদস্য পদে। একটি জেলার অধীনে একটি উপজেলাকে তিন-পাঁচটি ওয়ার্ডে ভাগ করা হবে। বড় উপজেলা হলে সেখানে পাঁচটি ওয়ার্ড গণ্য করা হবে। বাকিগুলোকে তিনটি ওয়ার্ডে ভাগ করা হবে। কোনো জেলায় যদি ১০টি উপজেলা থাকে, তাহলে জেলা পরিষদে মোট সদস্য হবেন ন্যূনতম ৩০ জন। তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে ভোট দেবেন ওই ৩০ জন। এ পদে প্রার্থীও হতে পারবেন শুধু নির্বাচিত সদস্যরা।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন-২০২৪ কর্তৃক নির্দিষ্ট এলাকায় একই দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব সাশ্রয়ী ও বিশ্বাসযোগ্য হবে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে, একই এলাকায় সব ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন একদিনে করার। এতে নির্বাচনী ব্যয় কমবে। তারা বলছে, এ নির্বাচন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধাপে ধাপে হতে পারে। তবে একই এলাকায় একসঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হবে। তাতে একজন ভোটার একসঙ্গে দুটি বা তিনটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সদস্য নির্বাচনে ভোট দেবেন। যেমন কোনো একটি জেলায় নির্বাচন হলে সেখানে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় সদস্য নির্বাচনে ভোট দেবেন ভোটাররা। আর সিটি করপোরেশন এলাকা হলে সেখানে ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচনে ভোট দেবেন।
১৯৯৭ সালে প্রণীত স্থানীয় সরকার কমিশনের প্রতিবেদনেও জেলা পরিষদের কার্যক্রমকে মাত্র নয়টিতে সীমিত করার সুপারিশ হয়। পূর্বতন বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক পদ্ধতি বর্তমানে আর কার্যকর নয়। তাই উপজেলা পরিষদের অনুরূপ জেলা পরিষদেও সরকারি কার্যক্রমের মধ্যে হস্তান্তরিত ও সংরক্ষিত—এ দুই ধরনের দপ্তর থাকতে পারে এবং ওইভাবেই কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর আদল সমতলের জেলা পরিষদগুলোয় হুবহু না হলেও বেশির ভাগই বাস্তবায়ন করা যায়। পুরো জেলায় পরিচালিত বিভিন্ন স্থানীয় সংস্থা, পরিষদ ও সরকারি দপ্তরগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে সমন্বিত করে একটি সমন্বিত জেলা পরিকল্পনা তৈরি করবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো এসব পরিকল্পনা নিজ নিজ প্রয়োজন, অগ্রাধিকার ও সম্পদের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে।
জেলা পরিষদ এ পরিকল্পনাগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্বৈত্বতা ও অপচয় রোধ করতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করবে। সব স্থানীয় পরিষদ, সরকারি দপ্তর ও বেসরকারি সংগঠনের প্রকল্পগুলোর সঙ্গে জেলা পরিষদের নিজস্ব প্রকল্পগুলো যোগ করে একটি জেলা পরিকল্পনা বই তৈরি করে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থায় তা সরবরাহ করবে। জেলা পরিষদ নিজস্ব উদ্যোগে আন্তঃউপজেলা সড়ক, মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, মাঝারি ও বৃহৎ পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা বিশেষত খাল নদীর প্রবাহ নিশ্চিত করা ইত্যাদি কার্যক্রমের পরিকল্পনা করবে। জেলা পর্যায়ে অবস্থিত সব সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোর তদারকি ও কার্যক্রম পরিবীক্ষণ করবে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কার্যনির্বাহী পরিষদ, অভিভাবক পরিষদ, ছাত্র পরিষদ ইত্যাদি গঠনে জেলা পরিষদ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
জেলা পর্যায়ের সব সরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকের সেবার মান নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা যাতে নিজ নিজ ওই পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো পালন করে তা নিশ্চিত করবে। জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে পুলিশ বিভাগের কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে। জেলায় শিল্প বাণিজ্য প্রসারের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিনোদন, খেলাধুলা প্রভৃতি বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে পৃষ্ঠপোষকতা করবে। সরকারের সভ মন্ত্রণালয়ের জেলা পর্যায়ের কার্যক্রমের তদারকি ও পর্যালোচনার অধিকারী হবে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম পরিকল্পনা সংশোধন, সংযোজন ও বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ আকারে সরকারের কাছে পেশ করবে।
প্রাথমিক অবস্থায় সব হস্তান্তরিত বিভাগের রাজস্ব ও সেবা বাজেট জেলা পরিষদ তহবিলে স্থানান্তরিত হবে। জেলা পরিষদ সংশ্লিষ্ট বিভাগ/দপ্তরগুলোর সহায়তায় প্রতিটি খাতের পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। সে পরিকল্পনাকে সামনে রেখে উন্নয়ন বাজেট প্রণীত হবে। একটি জেলায় সরকার কত অর্থ ব্যয় করে এবং কী কী কাজ হয়, তার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে। সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের চাকরির সব শর্তাদি (তথা পদায়ন পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, অবসর) বিদ্যমান ব্যবস্থা বহাল থাকবে। শুধু প্রেষণকালে তারা জেলা পরিষদের নির্দেশনায় কাজ করবেন। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সব অফিসপ্রধানের ‘বার্ষিক কার্যক্রম প্রতিবেদন’ লিখবেন। জেলা পর্যায়ের সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, ট্রেজারি রুলস, আয়ন-ব্যয়ন ক্ষমতা, প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে নতুন বিধি প্রণয়ন প্রয়োজন হতে পারে।
তাছাড়া জেলায় অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে যেসব দপ্তর-অধিদপ্তর রয়েছে তারা তাদের নিজ নিজ অধিদপ্তর ও সংস্থার অধীনে কাজ করলেও জেলা পরিষদের কাছে তাদের বিভাগীয় প্রকল্প ও পরিকল্পনা জমা করবেন এবং ওইসব প্রকল্প ও পরিকল্পনা জেলা পর্যায়ে জেলা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। তাই জেলা পরিষদ এসব কার্যক্রম বা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, কাজের গুণমান, অগ্রগতি ইত্যাদি পর্যালোচনা করার অধিকারী হবে এবং আন্তঃসংস্থা পরিকল্পনার সমন্বয় করবে। যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন, সড়ক, পয়োনিষ্কাশন, বৃহৎ নদী, খাল বা অন্যান্য পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ইত্যাদি জাতীয় পরিকল্পনা বা প্রকল্পগুলো জেলা পর্যায়ে জেলা পরিকল্পনা বইয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। জেলা পরিকল্পনা বই প্রণয়ন, এ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত সব প্রকল্প বা প্রকল্পাংশ পরিবীক্ষণ ও প্রভাব মূল্যায়নের মাধ্যমে জেলা পরিষদ হস্তান্তরিত ও সংরক্ষিত নির্বিশেষে সব উন্নয়ন কার্যক্রম তদারক করার অধিকারী হবেন। কোনো বিশেষ বিভাগের কর্মকর্তারা জেলা পরিষদের সঙ্গে এ ব্যাপারে অসহযোগিতা করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
জেলা পরিষদ পরিকল্পনা সমন্বয়ের জন্য একটি পরিকল্পনা ইউনিট গঠন করবে। জেলা পরিষদ প্রধান নির্বাহী, জেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, জেলা পরিকল্পনাবিদ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সহকারী প্রধান পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তরের একই পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা—এ পাঁচজন কর্মকর্তা মিলে পরিকল্পনা ইউনিট গঠিত হবে। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী হবেন এ ইউনিটের প্রধান এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হবেন সদস্য সচিব। পরিকল্পনা ইউনিটকে কার্যকর করার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তর থেকে দুজন কর্মকর্তাকে জেলা পর্যায়ে প্রেষণে নিয়োগ দিতে হবে।
যেসব বিষয় ও বিভাগগুলো জেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হয়নি, সেসব বিভাগ বা দপ্তর সরকারের সংরক্ষিত বিষয় বলে গণ্য হবে। তবে সংরক্ষিত বিষয়গুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনা সমন্বয়, কাজকর্ম পর্যালোচনা ইত্যাদির জন্য সরকার একটি সাধারণ বিধি প্রণয়ন করবে। এ বিধি অনুসারে সব সংরক্ষিত (Retained Sublect) বিষয়ের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা জেলা পরিষদের সঙ্গে তাদের সব কাজকর্মের সমন্বয় সাধন করবে। জেলা পর্যায়ে সরকারি যেসব বিভাগ জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত সেগুলোর সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা জেলা পরিষদে ন্যস্ত হবে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৪ কর্তৃক প্রদত্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন এবং জেলা পরিষদের নির্বাচন ব্যবস্থা, পরিকল্পনা ও কার্যকারিতা পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, কার্যকর এবং গ্রহণযোগ্য জেলা পরিষদ আশা করতে পারি।
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; অতিথি অধ্যাপক (ভিজিটিং প্রফেসর), অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ড এবং সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন